১৮ জুন ১০ রাজ্যের ২৪টি রাজ্যসভা আসনে নির্বাচন, অবসরে খাড়গে-দেবেগৌড়াসহ একাধিক বর্ষীয়ান নেতা
আসন্ন রাজ্যসভা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সরগরম হয়ে উঠেছে জাতীয় রাজনীতি। আগামী ১৮ জুন দেশের ১০টি রাজ্যের ২৪টি রাজ্যসভা আসনের জন্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে চলেছে। শুক্রবার এই সংক্রান্ত পূর্ণাঙ্গ সূচি ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন। রাজনৈতিক মহলের মতে, এই নির্বাচন শুধু উচ্চ সদনের আসন পূরণের প্রক্রিয়া নয়, বরং আগামী দিনের রাজনৈতিক সমীকরণ নির্ধারণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।
বিশেষ করে এই নির্বাচনে অবসর নিতে চলেছেন দেশের একাধিক বর্ষীয়ান ও প্রভাবশালী নেতা। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন কংগ্রেসের জ্যেষ্ঠ নেতা তথা প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী দিগ্বিজয় সিং, কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে এবং দেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী এইচ ডি দেবেগৌড়া। ফলে এই নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক উত্তাপ আরও বেড়েছে।
১০ রাজ্যের ২৪টি আসনে ভোট
নির্বাচন কমিশনের প্রকাশিত সূচি অনুযায়ী, মেঘালয়, মিজোরাম, অরুণাচল প্রদেশ, মণিপুর, মধ্যপ্রদেশ, কর্ণাটক, গুজরাট, রাজস্থান, অন্ধ্রপ্রদেশ এবং ঝাড়খণ্ড—এই ১০টি রাজ্যের মোট ২৪টি রাজ্যসভা আসনের জন্য ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে।
এই আসনগুলির বর্তমান সদস্যদের কার্যকাল আগামী কয়েক মাসের মধ্যে শেষ হতে চলেছে। সেই কারণেই নতুন সদস্য নির্বাচনের জন্য এই ভোটগ্রহণের আয়োজন করা হচ্ছে। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, এই নির্বাচন সংসদের উচ্চ সদনে বিভিন্ন দলের শক্তির ভারসাম্যে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
• গুজরাট – ৪টি আসন
• অন্ধ্রপ্রদেশ – ৪টি আসন
• কর্ণাটক – ৪টি আসন
• মধ্যপ্রদেশ – ৩টি আসন
• রাজস্থান – ৩টি আসন
• ঝাড়খণ্ড – ২টি আসন
• মণিপুর – ১টি আসন
• মেঘালয় – ১টি আসন
• অরুণাচল প্রদেশ – ১টি আসন
• মিজোরাম – ১টি আসন
এই রাজ্যগুলির মধ্যে কর্ণাটক, গুজরাট এবং মধ্যপ্রদেশের নির্বাচনকে ঘিরে বিশেষ রাজনৈতিক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। কারণ এই রাজ্যগুলিতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মধ্যে সরাসরি লড়াইয়ের সম্ভাবনা রয়েছে।
অবসর নিচ্ছেন দেশের একাধিক বর্ষীয়ান নেতা
এই নির্বাচনের অন্যতম বড় দিক হল— দেশের বহু অভিজ্ঞ এবং বর্ষীয়ান নেতার রাজ্যসভা মেয়াদ শেষ হতে চলেছে। তাঁদের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা এবং সংসদীয় ভূমিকা দীর্ঘদিন ধরেই জাতীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
মধ্যপ্রদেশ থেকে অবসর নিতে চলেছেন কংগ্রেসের প্রবীণ নেতা ও প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী দিগ্বিজয় সিং। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি কংগ্রেসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মুখ হিসেবে পরিচিত। সংসদে তাঁর বক্তব্য এবং রাজনৈতিক কৌশল বরাবরই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থেকেছে।
অন্যদিকে কর্ণাটক থেকে অবসর নিচ্ছেন দেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী এইচ ডি দেবেগৌড়া। জনতা দল (সেকুলার)-এর এই বর্ষীয়ান নেতা বহু দশক ধরে ভারতীয় রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ মুখ। তাঁর অবসরকে রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
এছাড়াও অবসর নিচ্ছেন কংগ্রেস সভাপতি তথা রাজ্যসভায় বিরোধী দলনেতা মল্লিকার্জুন খাড়গে। সংসদীয় রাজনীতিতে তাঁর অভিজ্ঞতা এবং বিরোধী রাজনীতিতে তাঁর ভূমিকা দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ফলে তাঁর মেয়াদ শেষ হওয়া জাতীয় রাজনীতিতে নতুন আলোচনা তৈরি করেছে।
রাজ্যসভা নির্বাচন কেন গুরুত্বপূর্ণ?
ভারতের সংসদীয় ব্যবস্থায় রাজ্যসভা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রতিষ্ঠান। লোকসভায় সরকার গঠন হলেও বহু গুরুত্বপূর্ণ বিল এবং আইন পাস করানোর ক্ষেত্রে রাজ্যসভার সমর্থন অত্যন্ত জরুরি। ফলে উচ্চ সদনে কোন দলের কতটি আসন রয়েছে, তা সরাসরি দেশের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাব ফেলে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে রাজ্যসভায় শক্তির ভারসাম্য আগামী দিনের কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে বড় ভূমিকা নিতে পারে। বিশেষ করে বিরোধী দলগুলির জন্য এই নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
অনেক সময় লোকসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকা সত্ত্বেও রাজ্যসভায় পর্যাপ্ত সমর্থন না থাকলে সরকারকে সমস্যায় পড়তে হয়। তাই এই নির্বাচন শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং কৌশলগত দিক থেকেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
নির্বাচন কমিশনের পূর্ণাঙ্গ সূচি
নির্বাচন কমিশনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, রাজ্যসভা নির্বাচনের জন্য বিজ্ঞপ্তি জারি করা হবে আগামী ১ জুন। মনোনয়ন জমা দেওয়ার শেষ তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে ৮ জুন।
পরের দিন অর্থাৎ ৯ জুন মনোনয়নপত্র যাচাই করা হবে। প্রার্থী প্রত্যাহারের শেষ তারিখ ১১ জুন। এরপর শুরু হবে চূড়ান্ত নির্বাচনী প্রস্তুতি।
• বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ – ১ জুন
• মনোনয়ন জমা দেওয়ার শেষ দিন – ৮ জুন
• মনোনয়ন যাচাই – ৯ জুন
• প্রার্থী প্রত্যাহারের শেষ দিন – ১১ জুন
• ভোটগ্রহণ – ১৮ জুন
• ভোটগণনা – ভোটগ্রহণের পরপরই
নির্বাচন কমিশনের ঘোষণা অনুযায়ী, ১৮ জুন সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত ভোটগ্রহণ চলবে। ভোট শেষ হওয়ার পরই গণনা শুরু হবে এবং ফলাফল প্রকাশ করা হবে।
ভোটগ্রহণে বিশেষ নির্দেশ
নির্বাচন কমিশন ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়াকে ঘিরে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশিকা জারি করেছে। কমিশনের তরফে জানানো হয়েছে, ব্যালট পেপারে পছন্দ চিহ্নিত করার জন্য শুধুমাত্র রিটার্নিং অফিসারের দেওয়া নির্দিষ্ট মানের সমন্বিত বেগুনি রঙের স্কেচ পেন ব্যবহার করা যাবে।
অন্য কোনও কলম ব্যবহার করলে সেই ভোট বাতিল বলে গণ্য হতে পারে। কমিশনের মতে, স্বচ্ছতা এবং সঠিক ভোটগণনা নিশ্চিত করতেই এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
এছাড়াও নির্বাচন প্রক্রিয়ার উপর কড়া নজরদারির জন্য বিশেষ পর্যবেক্ষক নিয়োগ করা হবে। কমিশনের দাবি, অবাধ ও স্বচ্ছ নির্বাচন নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সমস্ত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
মহারাষ্ট্র ও তামিলনাড়ুতেও উপনির্বাচন
শুধু নিয়মিত নির্বাচন নয়, নির্বাচন কমিশন একই সঙ্গে মহারাষ্ট্র এবং তামিলনাড়ুর রাজ্যসভার দুটি আসনের জন্য উপনির্বাচনের ঘোষণাও করেছে।
এই উপনির্বাচনগুলিও রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। কারণ রাজ্যসভায় প্রতিটি আসনই বর্তমানে রাজনৈতিক সমীকরণে বড় ভূমিকা পালন করছে।
কোন রাজ্যে কোন দল কতটা শক্তিশালী?
রাজ্যসভা নির্বাচন সাধারণ নির্বাচনের মতো সরাসরি জনগণের ভোটে হয় না। রাজ্যের বিধায়করা ভোট দিয়ে রাজ্যসভার সদস্য নির্বাচন করেন। ফলে সংশ্লিষ্ট রাজ্যে কোন দলের কতজন বিধায়ক রয়েছে, তার উপরই নির্ভর করে নির্বাচনের ফলাফল।
গুজরাট, মধ্যপ্রদেশ এবং কর্ণাটকে বিজেপি শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। অন্যদিকে কর্ণাটক ও রাজস্থানে কংগ্রেসও নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে চাইবে। ঝাড়খণ্ড এবং অন্ধ্রপ্রদেশে আঞ্চলিক দলগুলির ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
রাজনৈতিক মহলের মতে, এই নির্বাচন অনেক ক্ষেত্রে ভবিষ্যতের জোট রাজনীতির দিকও স্পষ্ট করতে পারে।
বিরোধী শিবিরের কাছে বড় পরীক্ষা
বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বিরোধী দলগুলির কাছে এই নির্বাচন বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে রাজ্যসভায় বিরোধীদের শক্তি ধরে রাখতে এই আসনগুলি গুরুত্বপূর্ণ।
মল্লিকার্জুন খাড়গের মেয়াদ শেষ হওয়ায় কংগ্রেসের অভ্যন্তরেও নতুন সমীকরণ তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। একই সঙ্গে বিরোধী জোটের ভবিষ্যৎ কৌশলও এই নির্বাচনের ফলাফলের উপর কিছুটা নির্ভর করতে পারে।
অন্যদিকে বিজেপি রাজ্যসভায় নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্যেই এগোচ্ছে বলে রাজনৈতিক মহলের ধারণা।
জাতীয় রাজনীতিতে বাড়ছে উত্তাপ
আগামী লোকসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ক্রমশ উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। এই পরিস্থিতিতে রাজ্যসভা নির্বাচন আরও বেশি তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
কারণ এই নির্বাচন শুধু সাংসদ নির্বাচনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং এটি বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সাংগঠনিক শক্তি, জোট রাজনীতি এবং ভবিষ্যৎ কৌশলেরও বড় পরীক্ষা।
বিশেষ করে দেশের বর্ষীয়ান নেতাদের অবসর এবং নতুন মুখের সম্ভাব্য আগমন রাজ্যসভাকে নতুন রাজনৈতিক রূপ দিতে পারে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
আগামী দিনের দিকে নজর
১৮ জুনের নির্বাচন ঘিরে ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক তৎপরতা শুরু হয়েছে। বিভিন্ন দল প্রার্থী বাছাই, জোট আলোচনা এবং কৌশল নির্ধারণে ব্যস্ত। আগামী কয়েক সপ্তাহ জাতীয় রাজনীতিতে এই নির্বাচনই অন্যতম বড় আলোচনার বিষয় হয়ে উঠবে বলেই মনে করা হচ্ছে।
দিগ্বিজয় সিং, মল্লিকার্জুন খাড়গে এবং এইচ ডি দেবেগৌড়ার মতো বর্ষীয়ান নেতাদের মেয়াদ শেষ হওয়ার কারণে এই নির্বাচন আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। নতুন মুখ কারা আসবেন, কোন দল কতটা শক্তিশালী অবস্থানে থাকবে— সেই দিকেই এখন নজর রাজনৈতিক মহলের।
সব মিলিয়ে বলা যায়, ১৮ জুনের রাজ্যসভা নির্বাচন শুধু একটি সাংবিধানিক প্রক্রিয়া নয়, বরং ভারতের জাতীয় রাজনীতির ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশ নির্ধারণের ক্ষেত্রেও বড় ভূমিকা নিতে চলেছে।


