বহুবিবাহ নিষিদ্ধ, বিবাহ রেজিস্ট্রেশন বাধ্যতামূলক — অসমে পাশ UCC বিল

Assam UCC Bill

অসম বিধানসভায় পাশ ইউনিফর্ম সিভিল কোড বা UCC বিল, দেশের তৃতীয় UCC রাজ্যের পথে অসম

তুমুল হট্টগোল, বিরোধীদের প্রবল আপত্তি এবং ধ্বনি ভোটের মধ্যেই গৃহীত ঐতিহাসিক বিল

অবশেষে দীর্ঘ রাজনৈতিক বিতর্ক, উত্তপ্ত আলোচনা এবং প্রবল বিরোধিতার মধ্যেই অসম বিধানসভায় পাশ হয়ে গেল ইউনিফর্ম সিভিল কোড বা UCC বিল। বুধবার অসম বিধানসভায় ধ্বনি ভোটে গৃহীত হয় এই ঐতিহাসিক বিধেয়ক। এর মাধ্যমে উত্তরাখণ্ড এবং গুজরাটের পর দেশের তৃতীয় UCC কার্যকরী রাজ্যের পথে এগোল অসম।

বিলটি পাশ হওয়ার সময় বিধানসভায় ব্যাপক হট্টগোলের সৃষ্টি হয়। বিরোধী দলগুলি একাধিক সংশোধনী প্রস্তাব আনে এবং বিলটিকে সিলেক্ট কমিটিতে পাঠানোর দাবি তোলে। তবে শেষ পর্যন্ত সমস্ত আপত্তি ও সংশোধনী খারিজ করে ধ্বনি ভোটের মাধ্যমে বিলটি গৃহীত হয়।

সরকার পক্ষের দাবি, এই বিল কার্যকর হলে রাজ্যে সকল নাগরিকের জন্য সমান আইনি কাঠামো প্রতিষ্ঠিত হবে। অন্যদিকে বিরোধীদের অভিযোগ, এই বিল সামাজিক ও ধর্মীয় বৈচিত্র্যের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে এবং তাড়াহুড়ো করে তা পাশ করানো হয়েছে।


বিধানসভায় উত্তপ্ত পরিস্থিতি

বুধবার সকাল থেকেই অসম বিধানসভায় ছিল টানটান উত্তেজনা। UCC বিল পেশ হওয়ার পর থেকেই বিরোধী দলগুলি তীব্র আপত্তি জানাতে শুরু করে। কংগ্রেস, রাইজর দল এবং তৃণমূল কংগ্রেসের বিধায়কেরা একাধিক সংশোধনী প্রস্তাব দেন। পাশাপাশি বিলটি নিয়ে আরও বিস্তারিত আলোচনার জন্য সিলেক্ট কমিটিতে পাঠানোর দাবি তোলেন তারা।

তবে বিধানসভার অধ্যক্ষ সেই দাবি খারিজ করে দেন। এরপরই বিরোধী সদস্যরা তুমুল বিক্ষোভ শুরু করেন। স্লোগান, টেবিল চাপড়ানো এবং বিক্ষোভের মধ্যেই আলোচনা এগোতে থাকে। শেষ পর্যন্ত প্রবল রাজনৈতিক সংঘাতের আবহেই ধ্বনি ভোটে বিলটি পাশ হয়ে যায়।

এই বিল নিয়ে কংগ্রেস ৭টি সংশোধনী, রাইজর দল ১৭টি সংশোধনী এবং তৃণমূল কংগ্রেস ২টি সংশোধনী প্রস্তাব আনে। কিন্তু সরকার পক্ষ সেগুলি গ্রহণ করেনি।


UCC বিলের মূল বৈশিষ্ট্য কী কী?

অসম বিধানসভায় গৃহীত UCC বিলের মধ্যে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিধান রাখা হয়েছে। সরকার দাবি করেছে, এই আইনের মাধ্যমে বিবাহ, পারিবারিক অধিকার এবং সামাজিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি একক আইনি কাঠামো প্রতিষ্ঠা করা হবে।

১. বহুবিবাহ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ

নতুন আইনে রাজ্যে বহুবিবাহ বা একাধিক বিয়ে সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সরকার বলছে, নারীদের অধিকার রক্ষার জন্য এই সিদ্ধান্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

২. বিবাহ নিবন্ধন বাধ্যতামূলক

বিল অনুযায়ী, রাজ্যে যেকোনো বিবাহকে আইনি স্বীকৃতি পেতে হলে বাধ্যতামূলকভাবে রেজিস্ট্রেশন করতে হবে। সরকার পক্ষের মতে, এর ফলে বিয়ের আইনি স্বচ্ছতা বাড়বে এবং প্রতারণা কমবে।

৩. লিভ-ইন সম্পর্কও নথিভুক্ত করতে হবে

নতুন আইনে লিভ-ইন সম্পর্কে থাকলেও তা সরকারিভাবে নথিভুক্ত বা রেজিস্টার করতে হবে। এই বিধান নিয়ে রাজনৈতিক মহল এবং সামাজিক সংগঠনগুলির মধ্যে ইতিমধ্যেই ব্যাপক বিতর্ক শুরু হয়েছে।

৪. ST সম্প্রদায়কে বিলের বাইরে রাখা হয়েছে

বিলের আওতায় রাজ্যের তফসিলি উপজাতি বা ST সম্প্রদায়ভুক্তদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। সরকার জানিয়েছে, উপজাতি সমাজের নিজস্ব রীতি-নীতি এবং ঐতিহ্যের কথা মাথায় রেখেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।


মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মার বক্তব্য

UCC বিল নিয়ে অসম বিধানসভায় দীর্ঘ ভাষণ দেন মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা। তিনি দাবি করেন, এই বিল কার্যকর হলে রাজ্যে সংখ্যালঘু তোষণের রাজনীতি বন্ধ হবে এবং সকল নাগরিকের জন্য সমান আইন নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “একটি আধুনিক এবং উন্নত সমাজ গড়তে হলে সকলের জন্য একই আইনি কাঠামো প্রয়োজন। ধর্মের ভিত্তিতে আলাদা আলাদা ব্যক্তিগত আইন একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য উপযুক্ত নয়।”

তিনি আরও বলেন, “ভারতের সংবিধানের নির্দেশমূলক নীতির মধ্যেই ইউনিফর্ম সিভিল কোডের কথা বলা রয়েছে। বহুদিন ধরেই এই বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে।”

হিমন্ত বিশ্বশর্মা দাবি করেন, UCC কার্যকর হলে নারীদের অধিকার আরও শক্তিশালী হবে এবং পরিবার ব্যবস্থায় আইনি স্বচ্ছতা আসবে।


কংগ্রেসকে তীব্র আক্রমণ

বিলের আলোচনা চলাকালীন কংগ্রেসকে তীব্র ভাষায় আক্রমণ করেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি অভিযোগ করেন, কংগ্রেস একটি বিশেষ ধর্মীয় গোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করছে এবং সংবিধানের চেয়ে ধর্মীয় আইনের পক্ষে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।

মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “আজ কংগ্রেস সংবিধানের কথা কম বলছে, কোরআন ও শরিয়তের কথা বেশি বলছে। ধর্মনিরপেক্ষতার প্রশ্নে তারা আপস করছে।”

একইসঙ্গে তিনি জনপ্রতিনিধিদের ধর্মনিরপেক্ষতার পক্ষে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান।

তার বক্তব্যকে ঘিরে বিধানসভায় আরও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। বিরোধী সদস্যরা মুখ্যমন্ত্রীর মন্তব্যের প্রতিবাদ জানান এবং একাধিকবার অধিবেশন স্থগিত করার দাবি তোলেন।


UCC-র ইতিহাস নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর দাবি

মুখ্যমন্ত্রী তার বক্তব্যে বলেন, ভারতে ইউনিফর্ম সিভিল কোডের ইতিহাস নতুন নয়। ১৯২৫ সাল থেকেই এই বিষয় নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছিল বলে তিনি দাবি করেন।

তিনি বলেন, “বিজেপি বা জনসংঘ গঠনের আগেই কংগ্রেস UCC নিয়ে আলোচনা করেছিল। কিন্তু বর্তমানে কংগ্রেস সাম্প্রদায়িক শক্তির কাছে আত্মসমর্পণ করেছে।”

মুখ্যমন্ত্রীর এই বক্তব্যের পর বিরোধী বেঞ্চ থেকে তীব্র প্রতিবাদ শুরু হয়।


নারীদের অধিকার নিয়ে বড় ঘোষণা

UCC বিলের আলোচনায় নারীদের অধিকার সম্পর্কেও একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা করেন মুখ্যমন্ত্রী।

তিনি বলেন, নতুন আইনে পুত্র ও কন্যা উভয়েই পিতামাতার সম্পত্তিতে সমান অধিকার পাবে। এছাড়া বিবাহ বিচ্ছেদের মামলা চলাকালীন স্বামীকে স্ত্রীকে ভরণ-পোষণ দিতে হবে।

মৃত ব্যক্তির আত্মীয়দের জন্য দেওয়া আর্থিক সাহায্যের ক্ষেত্রেও জীবিত পিতা-মাতাকে অন্তর্ভুক্ত করার কথা ঘোষণা করা হয়েছে।

সরকার পক্ষের দাবি, এই বিধানগুলি নারী সুরক্ষা এবং সামাজিক ন্যায়ের দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।


বিরোধীদের অভিযোগ কী?

বিরোধী দলগুলির অভিযোগ, এত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিল নিয়ে যথেষ্ট আলোচনা হয়নি। তাদের দাবি, বিলটি তাড়াহুড়ো করে পাশ করানো হয়েছে।

কংগ্রেসের বক্তব্য, অসমের সামাজিক ও ধর্মীয় বৈচিত্র্যকে উপেক্ষা করে এই আইন আনা হচ্ছে। রাইজর দলও অভিযোগ করেছে, মানুষের ব্যক্তিগত জীবনে অতিরিক্ত সরকারি হস্তক্ষেপের পথ খুলে দেবে এই আইন।

বিশেষ করে লিভ-ইন সম্পর্ক বাধ্যতামূলকভাবে নথিভুক্ত করার বিধান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে বিরোধীরা।

তাদের দাবি, ব্যক্তিগত সম্পর্কের ওপর সরকারের নজরদারি বাড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।


দেশের তৃতীয় UCC রাজ্যের পথে অসম

অসমে UCC বিল পাশ হওয়ায় দেশজুড়ে নতুন রাজনৈতিক আলোচনা শুরু হয়েছে। এর আগে উত্তরাখণ্ড এবং গুজরাট UCC কার্যকর করার পথে এগিয়েছে। এখন অসমও সেই তালিকায় যুক্ত হতে চলেছে।

বিজেপি নেতৃত্বাধীন সরকার একে ঐতিহাসিক পদক্ষেপ হিসেবে তুলে ধরছে। তাদের দাবি, এই বিল দেশের আইনি সমতার পথে বড় অগ্রগতি।

অন্যদিকে বিরোধীদের মতে, বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং এর দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক প্রভাব নিয়ে আরও আলোচনা প্রয়োজন।


সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রভাব

বিশেষজ্ঞদের মতে, অসমে UCC কার্যকর হলে রাজ্যের সামাজিক এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বড় পরিবর্তন আসতে পারে।

একদিকে সরকার এটিকে নারী অধিকার, আইনি সমতা এবং আধুনিক আইনি কাঠামোর অংশ হিসেবে দেখছে। অন্যদিকে বিরোধী দল এবং বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য এবং ব্যক্তিগত স্বাধীনতার প্রশ্ন তুলছে।

বিশেষত উত্তর-পূর্ব ভারতের মতো বহুসাংস্কৃতিক অঞ্চলে এই ধরনের আইন কীভাবে কার্যকর হবে, তা নিয়ে ইতিমধ্যেই নানা মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে।


রাজনৈতিক মহলে নতুন বিতর্ক

অসম বিধানসভায় UCC বিল পাশ হওয়ার পর রাজনৈতিক মহলে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। বিজেপি এটিকে ঐতিহাসিক সংস্কার বলে দাবি করছে।

অন্যদিকে বিরোধীরা বলছে, এটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত পদক্ষেপ এবং আগামী নির্বাচনের আগে মেরুকরণের রাজনীতি করা হচ্ছে।

আগামী দিনে এই বিল নিয়ে আদালত পর্যন্ত আইনি লড়াই হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।


HEADLINES

  • অসম বিধানসভায় পাশ ইউনিফর্ম সিভিল কোড বিল
  • তুমুল হট্টগোলের মধ্যেই ধ্বনি ভোটে গৃহীত UCC বিধেয়ক
  • দেশের তৃতীয় UCC রাজ্যের পথে অসম
  • নতুন আইনে বহুবিবাহ নিষিদ্ধ, বিবাহের রেজিস্ট্রেশন বাধ্যতামূলক
  • লিভ-ইন সম্পর্ক নথিভুক্ত করা বাধ্যতামূলক

সমাপ্তি

অসম বিধানসভায় ইউনিফর্ম সিভিল কোড বা UCC বিল পাশ হওয়া নিঃসন্দেহে রাজ্যের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি বড় ঘটনা। সরকার পক্ষের মতে, এটি আইনি সমতা ও নারী অধিকারের দিকে বড় পদক্ষেপ। অন্যদিকে বিরোধীরা সামাজিক বৈচিত্র্য এবং ব্যক্তিগত স্বাধীনতার প্রশ্ন তুলে এর বিরোধিতা করছে।

সব মিলিয়ে অসমে UCC কার্যকর হওয়ার পথে এগোনো আগামী দিনে রাজ্যের রাজনীতি, সমাজ এবং আইনি কাঠামোতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল।


উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যেই অসম বিধানসভায় পাশ ইউনিফর্ম সিভিল কোড বা UCC বিল। বিরোধীদের একাধিক সংশোধনী ও সিলেক্ট কমিটির দাবি খারিজ। মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মার দাবি, UCC কার্যকর হলে সকল নাগরিকের জন্য সমান আইন নিশ্চিত হবে।

ইউসিসি বিল পাশ অসম বিধানসভায়, তুমুল হট্টগোলের মধ্যেই ধ্বনি ভোটে গৃহীত ঐতিহাসিক বিধেয়ক।

#UCC #UniformCivilCode #AssamAssembly #HimantaBiswaSarma #AssamPolitics #BreakingNews #BJP

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *