মশার বিরুদ্ধে মশা! ডেঙ্গি রুখতে নতুন অস্ত্র

Fighting Mosquitoes with Mosquitoes to Stop Dengue

মশককুলের বিরুদ্ধে লড়বে মশাই! ডেঙ্গি-জিকা রুখতে কোটি কোটি বিশেষ মশা ছাড়ার পরিকল্পনা গুগলের মূল সংস্থার

একেই বলে কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলা! ডেঙ্গি, চিকনগুনিয়া ও জিকার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে এবার অস্ত্র হতে চলেছে মশাই। শুনতে অবিশ্বাস্য লাগলেও, বিশ্বের অন্যতম প্রযুক্তি জায়ান্ট গুগলের মূল সংস্থা অ্যালফাবেট এমনই এক অভিনব প্রকল্প নিয়ে কাজ করছে, যার লক্ষ্য মশাবাহিত রোগের বিস্তার রোধ করা। আর সেই লক্ষ্যে প্রকৃতিতে ছাড়া হবে কোটি কোটি বিশেষভাবে প্রস্তুত করা পুরুষ মশা।

বর্তমান বিশ্বে ডেঙ্গি, চিকনগুনিয়া এবং জিকা ভাইরাস জনস্বাস্থ্যের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। প্রতি বছর বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ মশাবাহিত রোগে আক্রান্ত হন এবং হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু ঘটে। জলবায়ু পরিবর্তন, নগরায়ন এবং পরিবেশগত পরিবর্তনের কারণে এডিস মশার বিস্তার দ্রুত বাড়ছে। ফলে প্রচলিত কীটনাশক বা ফগিংয়ের মাধ্যমে মশা নিয়ন্ত্রণের পদ্ধতি অনেক ক্ষেত্রেই আর আগের মতো কার্যকর থাকছে না।

এই পরিস্থিতিতে নতুন সমাধানের খোঁজে বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরেই কাজ করছেন। সেই গবেষণারই এক যুগান্তকারী ফলাফল হতে পারে অ্যালফাবেটের জীববিজ্ঞান গবেষণা শাখা ‘ভ্যারিলি’-র নতুন উদ্যোগ।

কোথায় চালানো হবে এই প্রকল্প?

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের ফ্রেসনো কাউন্টিতে পরীক্ষামূলকভাবে এই প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যেই মার্কিন ফেডারেল নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে প্রায় ৩ কোটি ২০ লক্ষ বিশেষ পুরুষ এডিস ইজিপ্টাই মশা ছাড়ার অনুমতি চাওয়া হয়েছে।

তবে একসঙ্গে এত বিপুল সংখ্যক মশা ছাড়া হবে না। পরিকল্পনা অনুযায়ী, দুই বছরে ধাপে ধাপে এই মশাগুলো প্রকৃতিতে ছাড়া হবে। প্রথম বছরে প্রায় ১ কোটি ৬০ লক্ষ এবং দ্বিতীয় বছরে আরও ১ কোটি ৬০ লক্ষ মশা মুক্ত পরিবেশে ছাড়া হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ধীরে ধীরে মশা ছাড়ার ফলে প্রকল্পের কার্যকারিতা মূল্যায়ন করা সহজ হবে এবং সম্ভাব্য ঝুঁকিও পর্যবেক্ষণ করা যাবে।

সাধারণ মশা নয়, বিশেষভাবে প্রস্তুত করা পুরুষ মশা

এই প্রকল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, যে মশাগুলো ছাড়া হবে সেগুলো সাধারণ মশা নয়। গবেষণাগারে অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে এগুলোকে প্রস্তুত করা হয়েছে।

বিজ্ঞানীরা পুরুষ এডিস ইজিপ্টাই মশার শরীরে ‘ওলবাচিয়া পিপিয়েন্টিস’ (Wolbachia pipientis) নামের একটি বিশেষ ব্যাক্টেরিয়া সংক্রমিত করেছেন। এই ব্যাক্টেরিয়াটি প্রকৃতিতে বহু ধরনের পোকামাকড়ের শরীরে স্বাভাবিকভাবেই পাওয়া যায়। তবে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে এটি প্রজনন প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে সক্ষম।

এই বিশেষ প্রযুক্তির সাহায্যে এমন এক পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছে, যাতে সংক্রমিত পুরুষ মশা বন্য পরিবেশে থাকা স্ত্রী মশার সঙ্গে মিলিত হলে ডিম তৈরি হলেও তা থেকে আর কার্যকর বংশধর জন্ম নিতে পারে না।

ফলে ধীরে ধীরে ওই অঞ্চলে এডিস মশার সংখ্যা কমতে শুরু করবে।

পুরুষ মশা মানুষকে কামড়ায় না

অনেকের মনেই প্রশ্ন উঠতে পারে—যদি কোটি কোটি মশা ছাড়া হয়, তাহলে কি মানুষের উপর মশার আক্রমণ আরও বেড়ে যাবে?

বিজ্ঞানীরা বলছেন, এর উত্তর হলো ‘না’।

কারণ প্রকল্পে ব্যবহৃত মশাগুলো সবই পুরুষ মশা। আর পুরুষ মশা মানুষের রক্ত খায় না এবং কামড়ায়ও না।

শুধুমাত্র স্ত্রী মশাই ডিম উৎপাদনের জন্য মানুষের বা প্রাণীর রক্ত সংগ্রহ করে। পুরুষ মশা মূলত ফুলের মধু, উদ্ভিদের রস এবং প্রাকৃতিক শর্করা জাতীয় খাদ্য গ্রহণ করে বেঁচে থাকে।

ফলে মানুষের শরীরে কামড় বা রোগ সংক্রমণের ঝুঁকি নেই বলেই দাবি গবেষকদের।

কীভাবে কমবে ডেঙ্গি, জিকা ও চিকনগুনিয়া?

ডেঙ্গি, জিকা এবং চিকনগুনিয়া রোগের প্রধান বাহক হলো এডিস ইজিপ্টাই প্রজাতির মশা।

যখন বিশেষভাবে প্রস্তুত পুরুষ মশা বন্য স্ত্রী মশার সঙ্গে মিলিত হবে, তখন উৎপন্ন ডিমগুলো কার্যকরভাবে বিকশিত হতে পারবে না। ফলে নতুন মশার জন্ম কমতে থাকবে।

একসময় ওই এলাকায় এডিস মশার সংখ্যা নাটকীয়ভাবে হ্রাস পাবে।

গবেষকদের দাবি, ধারাবাহিকভাবে এই পদ্ধতি ব্যবহার করলে মশার জনসংখ্যা ৯৫ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে আনা সম্ভব হতে পারে।

আর মশার সংখ্যা কমে গেলে স্বাভাবিকভাবেই কমবে ডেঙ্গি, চিকনগুনিয়া এবং জিকা ভাইরাসের সংক্রমণ।

ডিবাগ ফ্রেসনো’ প্রকল্পের সূচনা

এই প্রকল্পের নাম রাখা হয়েছে ‘ডিবাগ ফ্রেসনো’ (Debug Fresno)।

২০১৪ সাল থেকে এই প্রকল্পের আওতায় বিজ্ঞানীরা মশাবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণের জন্য নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

প্রথমদিকে ছোট পরিসরে বিভিন্ন পরীক্ষামূলক কার্যক্রম পরিচালিত হয়। গবেষণাগারে এবং সীমিত মাঠপর্যায়ের পরীক্ষায় ইতিবাচক ফলাফল পাওয়ার পর এখন বৃহত্তর পর্যায়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

ভ্যারিলির গবেষকরা বলছেন, প্রচলিত পদ্ধতির সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে একটি দীর্ঘমেয়াদি এবং পরিবেশবান্ধব সমাধান খুঁজে বের করাই তাদের মূল লক্ষ্য।

কেন নতুন পদ্ধতির প্রয়োজন?

দশকের পর দশক ধরে মশা নিয়ন্ত্রণে রাসায়নিক কীটনাশক ব্যবহার করা হচ্ছে।

ফগিং, স্প্রে এবং বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহারের মাধ্যমে মশার সংখ্যা কমানোর চেষ্টা করা হয়। কিন্তু এই পদ্ধতির বেশ কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে।

প্রথমত, রাসায়নিক কীটনাশক শুধু ক্ষতিকর মশাকেই মারে না, অনেক উপকারী পোকামাকড়ও এর শিকার হয়। মৌমাছি, প্রজাপতি এবং অন্যান্য পরাগায়নকারী প্রাণীর উপর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

দ্বিতীয়ত, দীর্ঘদিন একই ধরনের রাসায়নিক ব্যবহার করলে মশার মধ্যে প্রতিরোধ ক্ষমতা বা রেজিস্ট্যান্স তৈরি হয়। ফলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই রাসায়নিকের কার্যকারিতা কমে যায়।

তৃতীয়ত, পরিবেশ দূষণের ঝুঁকিও থেকে যায়।

এই কারণেই বিজ্ঞানীরা জৈবিক বা বায়োলজিক্যাল পদ্ধতির দিকে ঝুঁকছেন।

পরিবেশবান্ধব সমাধান?

গবেষকদের দাবি, ওলবাচিয়া-ভিত্তিক এই প্রযুক্তি পরিবেশের জন্য তুলনামূলকভাবে নিরাপদ।

এতে কোনও বিষাক্ত রাসায়নিক ব্যবহার করা হয় না। ফলে মাটি, পানি কিংবা অন্যান্য প্রাণীর উপর ক্ষতিকর প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা অনেক কম।

এছাড়া এই পদ্ধতি অত্যন্ত লক্ষ্যভিত্তিক। এটি শুধুমাত্র নির্দিষ্ট প্রজাতির মশার বংশবৃদ্ধিকে প্রভাবিত করে।

ফলে অন্যান্য উপকারী পোকামাকড় বা প্রাণী তুলনামূলকভাবে নিরাপদ থাকে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতে নগরাঞ্চলে মশা নিয়ন্ত্রণে এই প্রযুক্তি একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে।

কোনও ঝুঁকি আছে কি?

যদিও প্রকল্পটি নিয়ে ব্যাপক আশাবাদ তৈরি হয়েছে, তবুও বিজ্ঞানীরা সতর্কতা অবলম্বন করছেন।

মানুষের স্বাস্থ্যের উপর কোনও প্রভাব পড়বে কি না, তা নিয়ে বিস্তারিত পরীক্ষা চলছে।

গবেষকরা খতিয়ে দেখছেন, এই বিশেষ মশাগুলি মানুষের শরীরে কোনও ধরনের অ্যালার্জি, সংবেদনশীলতা বা নতুন স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে কি না।

এছাড়া দীর্ঘমেয়াদে পরিবেশগত প্রভাবও মূল্যায়ন করা হচ্ছে।

কারণ প্রকৃতিতে প্রতিটি প্রাণীরই একটি নির্দিষ্ট ভূমিকা রয়েছে।

খাদ্যশৃঙ্খলে প্রভাব পড়বে?

সমালোচকদের একটি বড় উদ্বেগ হলো খাদ্যশৃঙ্খল বা ফুড চেইনের উপর সম্ভাব্য প্রভাব।

ব্যাঙ, টিকটিকি, মাকড়সা, পাখি এবং বিভিন্ন ছোট প্রাণী মশা খেয়ে বেঁচে থাকে।

যদি কোনও অঞ্চলে মশার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়, তাহলে সেই প্রাণীদের খাদ্য সরবরাহে কোনও প্রভাব পড়বে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

তবে বিজ্ঞানীদের একাংশ বলছেন, এডিস ইজিপ্টাই মূলত বহিরাগত এবং আক্রমণাত্মক প্রজাতি। অনেক এলাকায় এটি স্থানীয় বাস্তুতন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশ নয়।

তাই এর সংখ্যা কমে গেলে পরিবেশগত ভারসাম্যের উপর বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা তুলনামূলকভাবে কম।

তবুও বিষয়টি নিয়ে নিবিড় পর্যবেক্ষণ চালানো হবে।

ভবিষ্যতে কি বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়বে এই প্রযুক্তি?

বর্তমানে পুরো প্রস্তাবটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরিবেশ সুরক্ষা সংস্থা এবং সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের পর্যবেক্ষণে রয়েছে।

সব ধরনের বৈজ্ঞানিক তথ্য, স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি এবং পরিবেশগত প্রভাব বিশ্লেষণ করার পরই চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হবে।

যদি প্রকল্পটি সফল হয়, তাহলে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এই প্রযুক্তি ব্যবহারের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।

বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়া, লাতিন আমেরিকা, আফ্রিকা এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মতো অঞ্চল, যেখানে ডেঙ্গি ও জিকা বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে, সেখানে এই প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

নতুন যুগের সূচনা?

ডেঙ্গি ও মশাবাহিত রোগ মোকাবিলায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দীর্ঘদিন ধরেই নানা ধরনের প্রযুক্তি পরীক্ষা করা হচ্ছে। জেনেটিক্যালি পরিবর্তিত মশা, জীবাণু-নিয়ন্ত্রিত প্রজনন প্রযুক্তি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-নির্ভর নজরদারি ব্যবস্থা ইতিমধ্যেই আলোচনায় এসেছে।

অ্যালফাবেটের ‘ডিবাগ ফ্রেসনো’ প্রকল্প সেই প্রচেষ্টারই একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

যদিও এখনও চূড়ান্ত অনুমোদন মেলেনি, তবুও বিজ্ঞানীরা আশাবাদী যে এই প্রযুক্তি ভবিষ্যতে ডেঙ্গি, জিকা ও চিকনগুনিয়ার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে এক নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারে।

মানবসভ্যতা বহুদিন ধরেই মশার বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে আসছে। এবার সেই যুদ্ধে মশাই যদি সবচেয়ে বড় অস্ত্র হয়ে ওঠে, তাহলে তা নিঃসন্দেহে হবে আধুনিক বিজ্ঞানের এক বিস্ময়কর সাফল্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *