মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাব এবার অসমসহ বরাকেও! ফের আকাশছোঁয়া পেট্রোল-ডিজেলের দাম, দিশেহারা সাধারণ মানুষ
নিজস্ব প্রতিনিধি | হাইলাকান্দি | ১৫ মে, ২০২৬
লাগামছাড়া মূল্যবৃদ্ধির বাজারে ফের বড়সড় ধাক্কা সাধারণ মানুষের পকেটে। দেশবাসীকে প্রধানমন্ত্রী Narendra Modi-র একের পর এক সতর্কবার্তার পর থেকেই যে আশঙ্কার মেঘ জমছিল, তা-ই এবার বাস্তবে পরিণত হলো। মধ্যপ্রাচ্যের চরম অস্থির যুদ্ধ পরিস্থিতির সরাসরি প্রভাব এবার পড়তে শুরু করেছে অসম তথা বরাক উপত্যকার জেলাগুলিতেও। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের সরবরাহ সংকট এবং উত্তপ্ত পরিস্থিতির জেরে এক লাফে অনেকটা বাড়ল জ্বালানির দাম।
জ্বালানির নতুন দাম কার্যকর হতেই ত্রাহি ত্রাহি রব সাধারণ মানুষের মধ্যে। বিশেষ করে পরিবহণ ব্যবসায়ী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এবং মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর কপালে চিন্তার ভাঁজ গভীর হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই মূল্যবৃদ্ধি কেবল পেট্রোল পাম্পেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়বে নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী এবং পরিবহণ খরচের ওপর।
পেট্রোল ও ডিজেলের নতুন দাম: এক নজরে
শুক্রবার থেকে কার্যকর হওয়া নতুন হার অনুযায়ী, বরাক উপত্যকার জেলাগুলিতে লিটার প্রতি পেট্রোল ও ডিজেলের দাম এক ধাক্কায় ৩ টাকার বেশি বেড়েছে। হাইলাকান্দি, শ্রীভূমি এবং কাছাড়ের পেট্রোল পাম্পগুলোতে সকাল থেকেই নতুন দামের বোর্ড ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে।
| জ্বালানির ধরন | পূর্ববর্তী দাম (টাকা) | বৃদ্ধির পরিমাণ (টাকা) | বর্তমান দাম (টাকা) |
|---|---|---|---|
| পেট্রোল (হাইলাকান্দি) | ৯৯.১৪ | ৩.১৩ | ১০২.২৭ |
| ডিজেল (হাইলাকান্দি) | ৯০.৩৯ | ৩.১৪ | ৯৩.৫৩ |
মেট্রো শহরগুলোতে জ্বালানির চিত্র
বরাক উপত্যকার পাশাপাশি দেশের অন্যান্য বড় শহরগুলোতেও দামের ঊর্ধ্বগতি লক্ষ্য করা গেছে। আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির চাপে দেশের জ্বালানি বাজার এখন টালমাটাল। নিচে বিভিন্ন মেট্রো শহরের বর্তমান দাম তুলে ধরা হলো:
- দিল্লি: পেট্রোল ৯৭.৭৭ টাকা, ডিজেল ৯০.৬৭ টাকা।
- কলকাতা: পেট্রোল ১০৮.৭৪ টাকা, ডিজেল ৯৫.১৩ টাকা।
- মুম্বাই: পেট্রোল ১০৬.৬৮ টাকা, ডিজেল ৯৩.১৪ টাকা।
- চেন্নাই: পেট্রোল ১০৩.৬৭ টাকা, ডিজেল ৯৫.২৫ টাকা।
কেন বাড়ছে দাম? পাম্প মালিক ও ব্যবসায়ীদের বক্তব্য
আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে তেল উৎপাদনকারী দেশগুলো থেকে সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় বিঘ্ন ঘটেছে। অপরিশোধিত তেলের (Crude Oil) আমদানি ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থেকেই বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়ছে।
"মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির সরবরাহে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। তেল আমদানির খরচ বেড়ে যাওয়ায় এই দাম বৃদ্ধি অনিবার্য ছিল।" - বিনোদ সারদা, স্থানীয় ব্যবসায়ী।
বরাকের বিভিন্ন পেট্রোল পাম্প মালিকদের দাবি, সরবরাহকারী সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকেই তাদের বাড়তি দামে তেল কিনতে হচ্ছে, যার প্রভাব সরাসরি খুচরো বাজারে পড়ছে। রাতারাতি এই দাম বৃদ্ধিতে পাম্পগুলোতে তেল নিতে আসা বাইক আরোহী এবং চালকদের মধ্যে ক্ষোভ ও উদ্বেগ লক্ষ করা গেছে।
বাজারে আগুন লাগার আশঙ্কা: সংকটে সাধারণ মানুষ
জ্বালানির দাম বাড়লে তার চেইন রিঅ্যাকশন বা ধারাবাহিক প্রভাব পড়ে অর্থনীতির প্রতিটি স্তরে। ডিজেলের দাম প্রতি লিটারে ৩ টাকা ১৪ পয়সা বাড়ার অর্থ হলো—ট্রাক, লরি এবং অন্যান্য পণ্যবাহী যানবাহনের ভাড়ায় বড়সড় বৃদ্ধি। এর ফলে:
- নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য: চাল, ডাল, তেল এবং অন্যান্য মুদি সামগ্রীর দাম বাড়বে।
- কাঁচাবাজার: ট্রাক ভাড়া বাড়লে সবজি এবং ফলের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যেতে পারে।
- নির্মাণ সামগ্রী: সিমেন্ট, রড ও ইটের পরিবহণ খরচ বাড়লে বাড়ি তৈরির খরচও বাড়বে।
- গণপরিবহণ: বাস ও অটো ভাড়া বাড়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে, যা নিত্যযাত্রীদের পকেটে টান দেবে।
পরিবহণ ব্যবসায়ীদের হুঁশিয়ারি
বরাক উপত্যকার পরিবহণ ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, দীর্ঘদিন ধরে জ্বালানির দাম এভাবে বাড়তে থাকলে তারা পুরনো ভাড়ায় গাড়ি চালাতে পারবেন না। যদি সরকার বা প্রশাসন এ বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ না নেয়, তবে অচিরেই যানবাহনের ভাড়া বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হবেন তারা। এতে সাধারণ যাত্রী ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ওপর আর্থিক চাপ আরও কয়েক গুণ বেড়ে যাবে।
উপসংহার
বর্তমানে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির দিকে তাকিয়ে জ্বালানির বাজার স্থিতিশীল হওয়ার অপেক্ষায় দিন গুনছেন হাইলাকান্দি তথা গোটা বরাক উপত্যকার মানুষ। একদিকে রমরমিয়ে চলা মূল্যবৃদ্ধি, অন্যদিকে জ্বালানির এই নতুন ধাক্কা—সব মিলিয়ে মধ্যবিত্তের নাভিশ্বাস ওঠার জোগাড়। পরিস্থিতি আরও জটিল হলে আগামী দিনে জ্বালানির দাম আরও বাড়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দিচ্ছেন না বাজার বিশেষজ্ঞরা। এখন দেখার বিষয়, সরকার এই লাগামছাড়া দাম নিয়ন্ত্রণে কোনো কার্যকরী পদক্ষেপ নেয় কি না।













Leave a Reply