ভারতীয় রাজনীতি · বিশেষ প্রতিবেদন
মহিলা মুখ্যমন্ত্রীর সংখ্যা কমছে — মমতার বিদায়ের পর দেশে একজনই বাকি
পশ্চিমবঙ্গে ঐতিহাসিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ভারতে নারী মুখ্যমন্ত্রীর ইতিহাস, বর্তমান পরিস্থিতি এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নিয়ে এক বিশদ বিশ্লেষণ।
(১৯৬৩ থেকে এখন পর্যন্ত)
মহিলা CM হয়েছেন
মহিলা মুখ্যমন্ত্রী
দীর্ঘ পনেরো বছর পশ্চিমবঙ্গের মসনদে থাকার পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিদায়ের মধ্য দিয়ে ভারতের নারী রাজনৈতিক নেতৃত্বের এক উজ্জ্বল অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটেছে। এই মুহূর্তে গোটা দেশে মাত্র একজন মহিলা মুখ্যমন্ত্রী রয়েছেন — দিল্লির রেখা গুপ্তা। এই প্রেক্ষাপটে আমরা ফিরে দেখব ভারতের মহিলা মুখ্যমন্ত্রীদের দীর্ঘ ও গৌরবময় ইতিহাস এবং বর্তমান পরিসংখ্যানের অন্তরালে লুকিয়ে থাকা রাজনৈতিক বাস্তবতা।
যাত্রার শুরু — সুচেতা কৃপালিনী ও ইতিহাসের প্রথম পদক্ষেপ
স্বাধীন ভারতের ইতিহাসে মহিলা মুখ্যমন্ত্রীর যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৯৬৩ সালের অক্টোবরে। সেদিন উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছিলেন কংগ্রেস নেত্রী সুচেতা কৃপালিনী। স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম সক্রিয় অংশগ্রহণকারী এই নেত্রী ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত তিন বছরেরও বেশি সময় সেই দায়িত্ব পালন করেছিলেন। শুধু দেশের প্রথম মহিলা মুখ্যমন্ত্রী হিসেবেই নয়, তিনি বিশ্বের প্রথম সারির মহিলা শাসকদের মধ্যেও একজন বলে বিবেচিত হন।
সুচেতার পথ ধরে পরবর্তী দশকগুলোতে একের পর এক মহিলা নেত্রী ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে ক্ষমতার শীর্ষে উঠে এসেছেন। তাঁদের প্রত্যেকে নিজের সময়ে, নিজের রাজ্যে ইতিহাস রচনা করেছেন। কেউ এসেছেন বংশরাজনীতির হাত ধরে, কেউ আবার নিজের যোগ্যতায় ও সংগ্রামের পথে উঠে এসেছেন শীর্ষে।
ভারতের মহিলা মুখ্যমন্ত্রীদের সম্পূর্ণ কালানুক্রমিক তালিকা
১৯৬৩ থেকে ২০২৬ পর্যন্ত মোট আঠারো জন মহিলা দেশের বিভিন্ন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। নিচে তাঁদের সম্পূর্ণ তালিকা দেওয়া হলো —
| নাম | রাজ্য | মেয়াদ | মোট সময় |
|---|---|---|---|
| সুচেতা কৃপালিনী | উত্তর প্রদেশ | ১৯৬৩ – ১৯৬৭ | ৩ বছর |
| নন্দিনী সতপথী | ওড়িশা | ১৯৭২ – ১৯৭৬ | ৪ বছর |
| শশীকলা কাকোদকর | গোয়া | ১৯৭৩ – ১৯৭৯ | ৫ বছর |
| সৈয়দা আনোয়ারা তৈমুর | আসাম | ১৯৮০ – ১৯৮১ | ২০৬ দিন |
| ভি এন জানকী রামচন্দ্রন | তামিলনাড়ু | ১৯৮৮ | ২৩ দিন |
| জে জয়ললিতা | তামিলনাড়ু | ১৯৯১ – ২০১৬ | ১৪ বছর |
| মায়াবতী | উত্তর প্রদেশ | ১৯৯৫ – ২০১২ | ৭ বছর |
| রাজিন্দর কৌর ভাট্টাল | পাঞ্জাব | ১৯৯৬ – ১৯৯৭ | ৮৩ দিন |
| রাবড়ি দেবী | বিহার | ১৯৯৭ – ২০০৫ | ৭+ বছর |
| সুষমা স্বরাজ | দিল্লি | ১৯৯৮ | ৫২ দিন |
| শীলা দীক্ষিত | দিল্লি | ১৯৯৮ – ২০১৩ | ১৫ বছর |
| উমা ভারতী | মধ্যপ্রদেশ | ২০০৩ – ২০০৪ | ২৫৯ দিন |
| বসুন্ধরা রাজে | রাজস্থান | ২০০৩ – ২০০৮, ২০১৩–১৮ | ১০ বছর |
| আনন্দিবেন প্যাটেল | গুজরাট | ২০১৪ – ২০১৬ | ২ বছর |
| মেহবুবা মুফতি | জম্মু ও কাশ্মীর | ২০১৬ – ২০১৮ | ২ বছর+ |
| মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় | পশ্চিমবঙ্গ | ২০১১ – ২০২৬ | ১৫ বছর |
| অতিশী মারলেনা | দিল্লি | ২০২৪ – ২০২৫ | ১৫২ দিন |
| রেখা গুপ্তা | দিল্লি | ২০২৫ – বর্তমান | একমাত্র বর্তমান |
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় — ১৫ বছরের এক অনন্য অধ্যায়
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উত্থান ছিল সম্পূর্ণ নিজের শক্তিতে। ঘাসফুলের প্রতীক হাতে নিয়ে তিনি ২০১১ সালে ৩৪ বছরের বামফ্রন্ট শাসনের অবসান ঘটিয়ে পশ্চিমবঙ্গের প্রথম মহিলা মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। এই জয় ছিল শুধু একটি নির্বাচনী বিজয় নয়, এটি ছিল দশকের পর দশকের লড়াই ও অধ্যবসায়ের পুরস্কার।
টানা তিনটি বিধানসভা নির্বাচনে (২০১১, ২০১৬, ২০২১) জয়লাভ করে মমতা প্রমাণ করেছিলেন যে একজন মহিলাও দীর্ঘমেয়াদে একটি বৃহৎ রাজ্য শাসন করতে সক্ষম। ২০২১ সালে বিজেপির সঙ্গে সরাসরি লড়াইয়ে জয় পেয়ে তিনি জাতীয় রাজনীতিতে নিজেকে মোদি বিরোধী অন্যতম প্রধান মুখ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। কিন্তু ২০২৬ সালের নির্বাচনে তাঁর দলের পরাজয় এবং তাঁর নিজের মুখ্যমন্ত্রীত্বের অবসানের মধ্য দিয়ে শেষ হলো একটি দীর্ঘ অধ্যায়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, মমতার বিদায় শুধু একটি দলের পরাজয় নয়। এটি ভারতের নারী রাজনৈতিক নেতৃত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপের সমাপ্তি। দেশের মোট আঠারো জন মহিলা মুখ্যমন্ত্রীর মধ্যে তিনিই সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদী একটানা শাসনকাল পরিচালনার রেকর্ড করেছেন।
"মহিলা মুখ্যমন্ত্রীদের সংখ্যা কমে যাওয়া মানে শুধু সংখ্যার পতন নয়, এটি সিদ্ধান্ত গ্রহণের কক্ষ থেকে নারীদের সরে যাওয়ার একটি উদ্বেগজনক সংকেত।"
— রাজনৈতিক বিশ্লেষক
বিজেপি শাসনে মহিলা নেতৃত্বের বাস্তব চিত্র
বিজেপি ও তার জোট শরিকরা মিলে বর্তমানে ভারতের ২৯টি রাজ্যের মধ্যে ১৭টিতে ক্ষমতায় রয়েছে। এই বিশাল রাজনৈতিক আধিপত্যের মধ্যে একটি প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই উঠে আসে — এত রাজ্যে ক্ষমতায় থাকা সত্ত্বেও মাত্র একজন মহিলাকে কেন মুখ্যমন্ত্রী করা হয়েছে?
তথ্য বলছে:
বিজেপি ১৭টি রাজ্যে ক্ষমতায় থাকলেও মাত্র দিল্লিতে একজন মহিলা মুখ্যমন্ত্রী রয়েছেন। সংসদে 'মহিলা সংরক্ষণ বিল' উত্থাপন করা হলেও সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকা সত্ত্বেও তা পাস করা হয়নি। পশ্চিমবঙ্গে নতুন সরকারেও মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে কোনো মহিলাকে বেছে নেওয়া হয়নি।
মহিলা সংরক্ষণ বিলের বিষয়টি বিশেষভাবে আলোচনার দাবি রাখে। পাঁচটি রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনের ঠিক আগে সংসদে এই বিল উত্থাপন করা হয়েছিল। রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, এই পদক্ষেপ ছিল নির্বাচনকেন্দ্রিক কৌশলগত সিদ্ধান্ত। বিল পাস না হওয়ার দায় বিরোধীদের ঘাড়ে চাপানো হলেও সত্য হলো, দলের নিজের অভ্যন্তরেই এই বিলের বিরুদ্ধে শক্তিশালী মত ছিল।
পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে বিজেপি মনোনীত মুখ্যমন্ত্রী পদে শুভেন্দু অধিকারীকে বেছে নেওয়া হয়েছে, যিনি একসময় মমতার ঘনিষ্ঠ ছিলেন এবং তারপর তৃণমূল ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দেন। ধারণা করা হয়েছিল যে হয়তো এবার বাংলায় কোনো মহিলা নেত্রীকে মুখ্যমন্ত্রী করা হতে পারে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা হয়নি।
রেখা গুপ্তা — একমাত্র মহিলা মুখ্যমন্ত্রী
২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে দিল্লি বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতায় জয়লাভ করে। মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন রেখা গুপ্তা। তিনি দিল্লির প্রথম বিজেপি মহিলা মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে ইতিহাস সৃষ্টি করেন। বর্তমানে তিনিই সমগ্র ভারতে একমাত্র কার্যরত মহিলা মুখ্যমন্ত্রী।
রেখা গুপ্তার আগে দিল্লিতে মহিলা মুখ্যমন্ত্রীর এক দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে। ১৯৯৮ সালে মাত্র ৫২ দিনের জন্য সুষমা স্বরাজ, তারপর ১৫ বছরের দীর্ঘ মেয়াদে শীলা দীক্ষিত এবং ২০২৪–২৫ সালে অতিশী মারলেনা দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন। এই ধারাবাহিকতায় রেখা গুপ্তা দিল্লিকে নারী নেতৃত্বের ঐতিহ্য বহনকারী রাজ্য হিসেবে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন।
সংখ্যার পতন এবং রাজনৈতিক বাস্তবতা
২০১৩–১৬ সালের মধ্যে ভারতে একসঙ্গে সর্বাধিক মহিলা মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। সেই সময় তামিলনাড়ুতে জয়ললিতা, দিল্লিতে শীলা দীক্ষিত, রাজস্থানে বসুন্ধরা রাজে এবং জম্মু ও কাশ্মীরে মেহবুবা মুফতি একযোগে ক্ষমতায় ছিলেন। কিন্তু সেই সোনালি যুগ ধীরে ধীরে বদলে গেছে।
✅ ভালো দিক
- ১৯৬৩ থেকে নারী নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা
- বিভিন্ন দলের নেত্রীরা ক্ষমতায় এসেছেন
- দিল্লিতে মহিলা CM-এর দীর্ঘ ঐতিহ্য
- জয়ললিতা, মমতার মতো শক্তিশালী নেতৃত্ব
❌ উদ্বেগের দিক
- ২৯ রাজ্যে মাত্র ১ জন মহিলা CM
- মহিলা সংরক্ষণ বিল এখনও কার্যকর নয়
- নতুন মহিলা নেতৃত্ব উঠে আসছে না
- বিজেপির ১৭ রাজ্যে মাত্র ১ জন মহিলা CM
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই পতনের পেছনে রয়েছে একটি গভীর কাঠামোগত সমস্যা। ভারতের রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনী প্রচারে মহিলাদের ব্যবহার করে ঠিকই, কিন্তু ক্ষমতার শীর্ষে মহিলাদের বসাতে সংকোচ বোধ করে। মহিলা সংরক্ষণ বিল পাস করা নিয়ে দলগুলোর মধ্যে যে দ্বিধা দেখা যায়, তা এই মানসিকতাকেই প্রতিফলিত করে।
ভবিষ্যৎ কোন পথে — আশার আলো কি আছে?
হতাশার মাঝেও আশার কথা হলো, ভারতের মহিলা রাজনীতিবিদরা ক্রমশ আরও সক্রিয় ও সোচ্চার হয়ে উঠছেন। পঞ্চায়েত থেকে সংসদ পর্যন্ত মহিলাদের অংশগ্রহণ বেড়েছে। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে মহিলা সাংসদের সংখ্যাও বৃদ্ধি পেয়েছে। এই নতুন প্রজন্মের মহিলা রাজনীতিবিদরাই আগামী দিনে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর আসনে উঠে আসতে পারেন।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, মহিলা সংরক্ষণ বিল যদি সত্যিকার অর্থেই কার্যকর হয় এবং রাজনৈতিক দলগুলো যদি ঘোষিত নীতি অনুযায়ী মহিলাদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করে, তাহলে আগামী দশকে পরিস্থিতি বদলাতে পারে। কিন্তু সেই পরিবর্তনের জন্য শুধু আইন নয়, দরকার রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং সামাজিক মানসিকতার পরিবর্তন।
সুচেতা কৃপালিনী থেকে শুরু করে জয়ললিতা, মায়াবতী, শীলা দীক্ষিত, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় — প্রতিটি নাম শুধু একটি ব্যক্তির নয়, একটি যুগের প্রতীক। তাঁরা প্রত্যেকে নিজের সময়ে প্রমাণ করেছেন যে নারী নেতৃত্ব কোনো বিকল্প নয়, এটি সমান যোগ্য ও কার্যকর। প্রশ্ন হলো, আগামী প্রজন্মের কাছে এই উত্তরাধিকার পৌঁছে দেওয়ার কাজটি কি সমাজ ও রাজনীতি মিলে করতে পারবে?
উপসংহার
মমতার বিদায়ের পর দেশে মাত্র একজন মহিলা মুখ্যমন্ত্রী অবশিষ্ট থাকার বিষয়টি নিছক একটি সংখ্যা নয়। এটি ভারতের রাজনীতিতে নারীর ক্ষমতায়নের পথে বিদ্যমান বাধাগুলির একটি স্পষ্ট প্রতিফলন। বক্তৃতায় 'নারী শক্তি' আর বাস্তবে সিদ্ধান্তের কক্ষে তাঁদের অনুপস্থিতি — এই দুটির মধ্যে ব্যবধান ঘোচানোই আগামী দিনের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ।
ইতিহাস বলছে, ভারতের মহিলারা বারবার প্রমাণ করেছেন যে তাঁরা যোগ্য নেতৃত্ব দিতে পারেন। এখন দেখার, ভবিষ্যতে রাজনীতি তাঁদের সেই সুযোগ দেয় কি না।
ট্যাগ:






Leave a Reply