অসম বাজেট ২০২৬-২৭: কর্মসংস্থান, জীবন প্রেরণা, অরুণোদয়, নতুন মেডিকেল কলেজ ও অবকাঠামোয় বড় ঘোষণা

Assam Budget
অসম বাজেট ২০২৬-২৭: কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অবকাঠামোয় বড় ঘোষণা

অসম বাজেট ২০২৬-২৭: কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি ও অবকাঠামোয় একাধিক বড় ঘোষণা

অসম বিধানসভায় ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষের পূর্ণাঙ্গ বাজেট পেশ করেছেন রাজ্যের অর্থমন্ত্রী জয়ন্ত মল্ল বড়ুয়া। এবারের বাজেটে সরকারের মূল লক্ষ্য হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন, স্বাস্থ্য পরিষেবা সম্প্রসারণ, কৃষকদের আর্থিক নিরাপত্তা, আধুনিক অবকাঠামো নির্মাণ এবং সামাজিক সুরক্ষা আরও শক্তিশালী করা। বাজেট বক্তৃতায় বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের জন্য একাধিক নতুন প্রকল্প ও আর্থিক সহায়তার ঘোষণা করা হয়েছে, যা আগামী দিনে রাজ্যের উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

সরকারের দাবি, এই বাজেট শুধুমাত্র বর্তমান অর্থনৈতিক চাহিদা পূরণের জন্য নয়, বরং আগামী কয়েক বছরের উন্নয়ন পরিকল্পনার দিকনির্দেশনাও নির্ধারণ করবে। কর্মসংস্থান, যোগাযোগ ব্যবস্থা, স্বাস্থ্যসেবা এবং শিক্ষাক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

রেশন ব্যবস্থায় ফিরছে চিনি, ডাল ও লবণ

বাজেটের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণাগুলোর মধ্যে রয়েছে আগামী আগস্ট মাস থেকে সরকারি রেশন ব্যবস্থায় পুনরায় চিনি, ডাল ও লবণ সরবরাহের সিদ্ধান্ত। দীর্ঘদিন পর এই সুবিধা পুনরায় চালু হওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের মাসিক খাদ্য ব্যয় কিছুটা কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।

একই সঙ্গে জনপ্রিয় অরুণোদয় প্রকল্পের আওতায় মাসিক আর্থিক সহায়তা পুনরায় চালুরও ঘোষণা করা হয়েছে। সমাজের অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল পরিবারের জন্য এই প্রকল্পটি দীর্ঘদিন ধরেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।

বেকার যুবকদের জন্য ‘জীবন প্রেরণা’ প্রকল্প

অসমের বেকার শিক্ষিত যুবকদের জন্য বাজেটে বড় ঘোষণা এসেছে। আগামী সেপ্টেম্বর মাস থেকে "জীবন প্রেরণা" প্রকল্প চালু হবে। এই প্রকল্পের আওতায় কর্মসংস্থানহীন স্নাতক যুবক-যুবতীদের প্রতি মাসে ২,৫০০ টাকা করে আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হবে।

সরকারের মতে, চাকরি খোঁজার সময় যাতে আর্থিক সমস্যার কারণে অনেকেই পিছিয়ে না পড়েন, সেই উদ্দেশ্যেই এই প্রকল্প চালু করা হচ্ছে। কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হওয়া পর্যন্ত এই সহায়তা অনেক পরিবারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

আত্মনির্ভর অসম প্রকল্পে নতুন সহায়তা

মুখ্যমন্ত্রীর আত্মনির্ভর অসম প্রকল্পের আওতায় ১২,৯৭৬ জনকে এক লক্ষ টাকা পর্যন্ত ঋণ দেওয়ার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। ক্ষুদ্র ব্যবসা, নতুন উদ্যোগ এবং স্বনিযুক্ত কর্মসংস্থানকে উৎসাহিত করাই এই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য।

এছাড়াও CMAAA ৩.০ প্রকল্পের মাধ্যমে আরও ৫০ হাজার যুবক-যুবতীকে এক লক্ষ টাকা পর্যন্ত আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে। রাজ্য সরকার আগামী পাঁচ বছরে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি খাতে মোট দুই লক্ষ নতুন কর্মসংস্থান তৈরির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।

স্বাস্থ্য খাতে বড় বিনিয়োগ

স্বাস্থ্য পরিষেবার সম্প্রসারণে এবারের বাজেটে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। হাইলাকান্দি, গোয়ালপাড়া, হোজাই এবং বাজালী জেলায় চারটি নতুন মেডিকেল কলেজ স্থাপনের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এর ফলে চিকিৎসা শিক্ষা ও স্বাস্থ্য পরিষেবা উভয় ক্ষেত্রেই উন্নতি ঘটবে বলে আশা করা হচ্ছে।

এছাড়া শ্রীভূমিতে AIIMS-মানের একটি আধুনিক চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার পরিকল্পনা ঘোষণা করা হয়েছে। এই প্রতিষ্ঠান চালু হলে বরাক উপত্যকার পাশাপাশি পার্শ্ববর্তী এলাকার মানুষও উন্নত চিকিৎসা পরিষেবা পাবেন।

শিক্ষাক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন

এবারের বাজেটে শিক্ষা ক্ষেত্রেও একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে স্কুটি বিতরণ প্রকল্প বন্ধ করে সেই অর্থ শিক্ষা সহায়তা প্রকল্পে স্থানান্তর করা হবে।

তবে ড. বাণীকান্ত কাকতি মেধা বৃত্তির আওতায় প্রায় ১৮ হাজার মেধাবী শিক্ষার্থী স্কুটি পাবে। পাশাপাশি ‘নিযুত মইনা’ এবং ‘নিযুত বাবু’ প্রকল্পের মাধ্যমে পাঁচ লক্ষ ত্রিশ হাজারেরও বেশি শিক্ষার্থী বিভিন্ন ধরনের আর্থিক সহায়তা ও শিক্ষা সুবিধা পাবে।

সরকারের মতে, এই পরিবর্তনের ফলে আরও বেশি সংখ্যক শিক্ষার্থী সরাসরি আর্থিক সহায়তার আওতায় আসবে এবং উচ্চশিক্ষায় অংশগ্রহণ বাড়বে।

কৃষকদের জন্য নতুন আর্থিক সহায়তা

কৃষি খাতে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের জন্য বছরে ১১ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তার প্রস্তাব করা হয়েছে। কৃষকদের উৎপাদন ব্যয় কমানো এবং আয় বৃদ্ধির লক্ষ্যে এই সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

একই সঙ্গে বরাকসহ একাধিক নদীর জল ব্যবহার করে আধুনিক সেচ প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এই প্রকল্পে প্রায় ৩ থেকে ৪ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হবে। উন্নত সেচ ব্যবস্থা চালু হলে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি এবং বহু কৃষকের আয় বাড়বে বলে আশা করছে সরকার।

অবকাঠামো উন্নয়নে হাজার হাজার কোটি টাকার প্রকল্প

যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়নে এবারের বাজেটে একাধিক বড় প্রকল্প ঘোষণা করা হয়েছে। শিলচর গ্রিনফিল্ড হাইস্পিড করিডোর নির্মাণের জন্য ২২,৮৬৪ কোটি টাকার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে বরাক উপত্যকার সঙ্গে অন্যান্য অঞ্চলের যোগাযোগ আরও দ্রুত ও উন্নত হবে।

অসম মালা ৪.০ প্রকল্পের আওতায় ১০ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ৮০০ কিলোমিটার নতুন সড়ক নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এছাড়া গুয়াহাটি বিমানবন্দর থেকে জালুকবাড়ি পর্যন্ত এলিভেটেড করিডোর নির্মাণ, নতুন ব্রহ্মপুত্র সেতু এবং যোরহাট-মাজুলি সেতুর কাজ ২০২৭ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

এই প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হলে শিল্প, ব্যবসা, পর্যটন এবং সাধারণ মানুষের যাতায়াত ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।

চা-জনগোষ্ঠীর জন্য বিশেষ উদ্যোগ

চা-শ্রমিক এবং চা-জনগোষ্ঠীর উন্নয়নের জন্যও একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা করা হয়েছে। গর্ভবতী চা-শ্রমিক মহিলাদের ১৫ হাজার টাকা আর্থিক সহায়তা দেওয়ার প্রস্তাব রাখা হয়েছে।

এছাড়া প্রায় সাড়ে তিন লক্ষ পরিবারকে জমির অধিকার প্রদান করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে জমির স্বত্বের অপেক্ষায় থাকা বহু পরিবার এই উদ্যোগের মাধ্যমে উপকৃত হতে পারে।

সরকারি কর্মচারীদের জন্য নতুন সুবিধা

সরকারি কর্মচারীদের কল্যাণে এবারের বাজেটে মাতৃত্বকালীন ছুটি সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা করা হয়েছে। পূর্ণ বেতনসহ মাতৃত্বকালীন সুবিধা অব্যাহত রাখার পাশাপাশি প্রথমবারের মতো পিতাদের জন্য দুই সপ্তাহের পিতৃত্বকালীন ছুটির প্রস্তাবও রাখা হয়েছে।

এই সিদ্ধান্ত কর্মজীবী পরিবারগুলোর জন্য ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

অর্থনৈতিক অগ্রগতির দাবি

অর্থমন্ত্রী জানান, অসমের মাথাপিছু আয় বেড়ে বর্তমানে ১ লক্ষ ৮৫ হাজার ৪২৯ টাকায় পৌঁছেছে। সরকারের দাবি অনুযায়ী, ২০১৫-১৬ সালের তুলনায় এই আয় তিন গুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে।

এছাড়া ২০৩১ সালের মধ্যে রাজ্যের নিজস্ব কর রাজস্ব ৫০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা বাড়ানোর জন্য শিল্প, ব্যবসা এবং বিনিয়োগ বৃদ্ধির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে বলে জানানো হয়েছে।

বিভাগভিত্তিক বাজেট বরাদ্দ

  • শিক্ষা বিভাগ: ১৮,৮৬৯ কোটি টাকা
  • জনস্বাস্থ্য প্রযুক্তি: ২,৯৮২ কোটি টাকা
  • কৃষি বিভাগ: ১,৭৮৯ কোটি টাকা
  • জলসম্পদ বিভাগ: ১,৬৭০ কোটি টাকা
  • লোকনির্মাণ বিভাগ: ৯৭৪ কোটি টাকা
  • জনজাতি উন্নয়ন: ৮০৮ কোটি টাকা
  • পশুপালন বিভাগ: ৭৭১ কোটি টাকা
  • দক্ষতা, কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা: ৪৯৬ কোটি টাকা
  • সামাজিক ন্যায়বিচার: ৪৮৯ কোটি টাকা
  • পরিবহন: ৪৮৮ কোটি টাকা
  • ক্রীড়া ও যুবকল্যাণ: ২০২ কোটি টাকা
  • ভূমি সংরক্ষণ: ১৫২ কোটি টাকা
  • বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি: ৯৭ কোটি টাকা
  • বরাক উপত্যকার উন্নয়ন: ১৭২ কোটি টাকা

বাজেটের সামগ্রিক মূল্যায়ন

২০২৬-২৭ অর্থবর্ষের অসম বাজেটে কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, সামাজিক সুরক্ষা এবং অবকাঠামো উন্নয়নের ওপর সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। শিক্ষিত বেকারদের জন্য মাসিক ভাতা, ক্ষুদ্র কৃষকদের আর্থিক সহায়তা, নতুন মেডিকেল কলেজ, AIIMS-মানের হাসপাতাল, বৃহৎ সড়ক ও সেতু প্রকল্প এবং সামাজিক কল্যাণমূলক উদ্যোগগুলিকে এই বাজেটের প্রধান আকর্ষণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বিশেষ করে যুব সমাজের কর্মসংস্থান, কৃষকদের আর্থিক নিরাপত্তা এবং অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে রাজ্যের অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্য স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে।

তবে বাজেটে ঘোষিত বিভিন্ন প্রকল্পের সফলতা নির্ভর করবে সেগুলোর বাস্তবায়নের গতি, স্বচ্ছতা এবং কার্যকারিতার ওপর। আগামী কয়েক মাসে বিভিন্ন প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি রাজ্যের মানুষের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠবে।

সামগ্রিকভাবে বলা যায়, অসম সরকারের ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষের বাজেট উন্নয়নমুখী একটি পরিকল্পনা হিসেবে সামনে এসেছে। কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য পরিষেবার সম্প্রসারণ, কৃষকদের সহায়তা এবং আধুনিক অবকাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে আগামী দিনের অসম গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়েই এই বাজেট প্রস্তুত করা হয়েছে। এখন রাজ্যবাসীর নজর থাকবে ঘোষণাগুলোর দ্রুত এবং কার্যকর বাস্তবায়নের দিকে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *