Vaibhav Suryavanshi — এক অবিশ্বাস্য উত্থানের গল্প

Vaibhav Suryavanshi
Vaibhav Sooryavanshi — বিহারের মাটি থেকে বিশ্বজয়
জীবনী · ক্রিকেট

বিহারের মাটি থেকে
Vaibhav Sooryavanshi
এক অবিশ্বাস্য উত্থানের গল্প

তাজপুরের প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে উঠে মাত্র ১৪ বছর বয়সে বিশ্বক্রিকেটের মঞ্চ কাঁপানো এক কিশোরের জীবনকথা।

জন্ম২০১১, তাজপুর, বিহার
দলরাজস্থান রয়্যালস · বিহার
কৃতিত্বসর্বকনিষ্ঠ আইপিএল সেঞ্চুরিয়ান

ভারতীয় ক্রিকেটের ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে যা দেখে মনে হয় — এটা কি সত্যিই ঘটছে? Vaibhav Sooryavanshi ঠিক সেই অনুভূতির নাম। বিহারের একটি প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে উঠে এসে মাত্র চোদ্দ বছর বয়সে আইপিএলে সেঞ্চুরি করা — এই গল্প বাস্তব, কোনো পরিকল্পিত চলচ্চিত্রের দৃশ্য নয়।

তাজপুর — যে গ্রাম থেকে শুরু

বিহারের সমস্তিপুর জেলার ছোট্ট একটি শহর তাজপুর। পটনা থেকে উত্তর-পূর্বে গেলে এই শহরের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। চারপাশে সবুজ মাঠ, কৃষিজমি, সরু গলির পাশে একতলা বাড়িঘর। এখানকার মানুষের জীবন সাদামাটা। Vaibhav Sooryavanshi-র পরিবার এই তাজপুরেই কয়েক দশক ধরে বাস করছেন — গহনার ব্যবসা আর চাষবাসে চলে তাঁদের সংসার।

Vaibhav-এর বাবা সঞ্জীব সূর্যবংশী নিজেও ক্রিকেটপ্রেমী ছিলেন। কিন্তু তাঁর সময়ে বিহার বিসিসিআইয়ের অনুমোদন পায়নি, তাই স্বপ্ন পূরণ হয়নি। একসময় তিনি মুম্বাই চলে গিয়েছিলেন ক্রিকেট ও অভিনয়ের টানে। শিপিং ইয়ার্ড, বন্দর, নাইটক্লাবে বাউন্সারের কাজ করেছেন। কিন্তু মহানগরীতে টিকে থাকার কঠিন লড়াই একসময় তাঁকে তাজপুরেই ফিরিয়ে আনে।

সঞ্জীবের মেজো ছেলে Vaibhav মাত্র চার বছর বয়সে প্রথম ব্যাট হাতে নিয়েছিল। বাবা তখনই বুঝেছিলেন এই ছেলের মধ্যে কিছু একটা আলাদা আছে। সেই বিশ্বাসই পরবর্তী বছরগুলোতে তাঁকে প্রতিদিন ভোর চারটেয় উঠে পুরনো মাহিন্দ্রা স্করপিওতে ১০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে অনুপ্রাণিত করেছে।

প্রশিক্ষণের কঠিন দিনগুলো

Vaibhav Sooryavanshi-র ক্রিকেট যাত্রা শুরু হয়েছিল ২০১৫ সালে সমস্তিপুরের পুরসভা মাঠে, কোচ ব্রজেশ ঝার হাত ধরে। মাত্র নয় বছর বয়সে তাঁর খেলায় ছিল পনেরো বছরের পরিপক্বতা। কোভিডের লকডাউনেও তাঁর জন্য বিশেষ ব্যবস্থা করা হয়েছিল।

এরপর Vaibhav পটনার জেন নেক্সট একাডেমিতে যোগ দেন, যেখানে কোচ মনীশ কুমার ওঝা তাঁর প্রতিভাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যান। সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য প্রতি সেশনে ২০০-২৫০টি বল হলেও Vaibhav-এর ক্ষেত্রে প্রতিদিন কমপক্ষে ৬০০ বল মোকাবিলা করাই ছিল নিয়ম। ওঝা কখনো তাঁকে ডিফেন্সের অনুশীলন করাননি — লক্ষ্য ছিল প্রতিটি বলের বিপরীতে যত বেশি সম্ভব স্ট্রোক তৈরি করা।

এই প্রশিক্ষণের জন্য সঞ্জীব প্রতি দুদিনে একবার ২০০ কিলোমিটারের যাত্রা করতেন। মায়ের হাতে তৈরি নাস্তা ও দুপুরের খাবার সঙ্গে নিয়ে — পুরো পরিবারটাই এই স্বপ্নের ভার বহন করেছে।

৩৫ বলে আইপিএল সেঞ্চুরি
১৭৫ বিশ্বকাপ ফাইনালে রান
৪৪৪ বিশ্বকাপে মোট রান
১৬২ স্ট্রাইক রেট (বিশ্বকাপ)

রাজস্থান রয়্যালসের চোখে পড়া

২০২৪ সালের অক্টোবরে মহারাষ্ট্রের তালেগাঁওতে রাজস্থান রয়্যালসের ট্রায়ালে Vaibhav Sooryavanshi-কে প্রথমবার দেখেন দলের ক্রিকেট বিভাগের প্রধান জুবিন ভরুচা। একজন বাঁহাতি পেসার দেরিতে সুইং করা বল করলেন — Vaibhav সেটাকে এক্সট্রা কভারের ওপর দিয়ে ছয় মেরে দিলেন। ভরুচা নিজেই স্বীকার করেন, সেই মুহূর্তে তিনি বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না।

এরপর ভরুচা সবাইকে মাঠ থেকে সরিয়ে Vaibhav-কে একা ১৫৭-১৫৮ কিলোমিটার গতিতে বল ছোড়া সাইডআর্মারদের মুখোমুখি করেন। Vaibhav শান্তভাবে বললেন, "হ্যাঁ স্যার, কোনো সমস্যা নেই।" সেই সেশনেই তিনি ১৫৭ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টা গতির একটি বলকে সাইটস্ক্রিনের ওপর দিয়ে ছয় মেরে দিলেন।

"আমি তাঁদের বলেছিলাম, সে ইয়াসাসভি জয়সওয়ালের দ্বিগুণ। এই সুযোগ হাতছাড়া করো না।" — জুবিন ভরুচা, রাজস্থান রয়্যালস

নভেম্বর ২০২৪-এর আইপিএল মেগা অকশনে রাজস্থান রয়্যালস মাত্র ১.১ কোটি রুপিতে Vaibhav Sooryavanshi-কে দলে নেয়। ভরুচা বলেছিলেন ১০ কোটি রুপি আলাদা রাখতে — বাস্তবে লেগেছে তার মাত্র দশভাগ।

আইপিএল ২০২৫ — ইতিহাস রচনা

২০২৫ আইপিএলে Vaibhav Sooryavanshi প্রথম বলেই ছয় মেরে নিজের আগমন জানান দেন। গুজরাট টাইটান্সের বিপক্ষে মাত্র ৩৫ বলে সেঞ্চুরি করেন — মাত্র ১৪ বছর ৩২ দিন বয়সে পুরুষদের টি-টোয়েন্টিতে সর্বকনিষ্ঠ সেঞ্চুরিয়ান হিসেবে ইতিহাস লেখেন। এই ইনিংসটি আইপিএলের দ্বিতীয় দ্রুততম সেঞ্চুরি — শুধু ২০১৩ সালে ক্রিস গেইলের ৩০ বলের সেঞ্চুরিই এর আগে।

এর আগে ফেব্রুয়ারি ২০২৫-এ আন্ডার-১৯ বিশ্বকাপ ফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে Vaibhav মাত্র ৮০ বলে ১৭৫ রান করেন — ১৫টি ছয় সহ, যা একটি যুব একদিনের ম্যাচে একক ইনিংসে সর্বোচ্চ। পুরো টুর্নামেন্টে ১৬২.৪৯ স্ট্রাইক রেটে মোট ৪৪৪ রান করে ভারতকে শিরোপা জেতান।

মাঠের বাইরের মানুষটি

সংখ্যার বাইরে Vaibhav Sooryavanshi-র আসল শক্তি তাঁর মানসিকতা ও পরিপক্বতায়। একবার মাঠে বিপক্ষ দলের বোলার তাঁকে উত্তেজিত করার চেষ্টা করলে তিনি সীমারেখা অতিক্রম করেন, কিন্তু পরে নিজেই কোচের কাছে এসে বলেন, "স্যার, আমার ভুল হয়ে গেছে।" এই আত্ম-সংশোধনের ক্ষমতা তাঁর বয়সে বিরল।

মিষ্টি খাওয়া নিয়েও একটি মজার কাহিনি আছে। কোচের কাছে "এক টুকরো" মিষ্টির অনুমতি নিতেন — কিন্তু রুমমেট মুশির খান পরে ফাঁস করেন, অনুমতি নেওয়ার আগেই সাত-আটটি খাওয়া শেষ! তবে যখন বুঝলেন এটা ফিটনেসে প্রভাব ফেলছে, বিনা বাক্যব্যয়ে ছেড়ে দিলেন। বিশ্বকাপ ফাইনালের আগের রাতে তিনি ভরুচাকে ফোন করে জানান ছন্দ একটু বেঠিক লাগছে। ভরুচা বলেছিলেন স্বাভাবিকভাবেই খেলতে। পরের দিন ফলাফল সবাই দেখেছেন।

ভবিষ্যতের পথে

২০২৩-২৪ মৌসুমে মাত্র ১২ বছর ২৮৪ দিন বয়সে রণজি ট্রফিতে অভিষেক করেন Vaibhav Sooryavanshi — ১৯৮৬ সালের পর ভারতের সর্বকনিষ্ঠ প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটার। এরপর থেকে তিনি বিহার দলের ভাইস-ক্যাপ্টেন। জুবিন ভরুচা বলেন, Vaibhav ব্যাটিং নিয়ে কথা বলেন চব্বিশ বছরের পরিণত ক্রিকেটারের মতো। তাঁর অনন্য ব্যাকলিফট — যা ব্রায়ান লারার কথা মনে করিয়ে দেয় — তাঁকে শর্ট বলের বিপক্ষে অসাধারণ সুবিধা দেয়।

ভরুচা আরও বলেন, Vaibhav-এর মধ্যে নেতৃত্বের স্পষ্ট ছাপ দেখা যাচ্ছে। সতীর্থরা ভালো শট খেললে প্রথমেই উৎসাহ দেন তিনি। দলের পরিস্থিতি সম্পর্কে সবসময় সচেতন থাকেন। এই মানসিক দৃঢ়তা ও দলীয় মনোভাব তাঁকে ভবিষ্যতে ভারতীয় ক্রিকেটের একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা হিসেবে গড়ে তুলবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।

তাজপুরের সেই ছোট্ট গ্রামে আজ রাস্তার পাশে সাইনবোর্ড — "Vaibhav Sooryavanshi-র গ্রামে আপনাকে স্বাগতম।" সমস্তিপুরের পুরসভা মাঠে এখন ষাটেরও বেশি শিশু প্রতিদিন ক্রিকেট শেখে — সবাই Vaibhav-এর অনুপ্রেরণায়। ২০২৪ সালে একটি ১৩ বছরের ছেলের জন্য ১০ কোটি রুপি আলাদা রাখতে বলাটা মনে হয়েছিল পাগলামো। আজ পেছনে তাকালে মনে হয়, রাজস্থান রয়্যালস আসলে সস্তায়ই পেয়ে গেছে। Vaibhav Sooryavanshi-র গল্প এখনও লেখা হচ্ছে — এবং সেরা অধ্যায়গুলো এখনও আসতে বাকি।

তথ্যসূত্র: মূল ঘটনা ও তথ্য ESPNcricinfo / The Cricket Monthly অবলম্বনে, সম্পূর্ণ নতুনভাবে রচিত বাংলা জীবনী।

© ২০২৬ — সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *